ভূ-রাজনীতি হোক আর নিজের শক্তিমত্তার জানান দেওয়ার জন্য হোক, বর্তমানে চীনের বাজার থেকে ক্রমেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে চীনাদের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রকম পণ্য আর আগের মতো আমদানি হচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্রে। আর এতে সুযোগ বেড়েছে বাংলাদেশের। মার্কিন ক্রেতারা এখন বেশি করে তৈরি পোশাক কিনতে বাংলাদেশের বাজারের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। এ সুযোগে পোশাক শিল্পে প্রধান দুই প্রতিযোগী দেশ চীন ও ভিয়েতনামকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে ক্রমেই আরো ভালো অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তার প্রমাণ মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে সবার ওপরে চলে এসেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ৫৭১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। ২০২১ সালের একই সময়ের তুলনায় দেশটিতে এ বছর পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫৪.৪৩ শতাংশ। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে এমন তথ্য মিলেছে।সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বাজারটিতে রপ্তানি কমে যায়। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে ২০১৯ সালে বাজারটি ফের বাংলাদেশকে বেছে নেয়। করোনার কারণে রপ্তানি নিম্নমুখী হলেও গত বছরের মে মাস থেকে বাজারটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আবার বাড়াতে শুরু করে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সহ-সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, ‘মার্কিন বাজারে আমাদের পোশাক রপ্তানিতে এতো উল্লম্ফনের প্রধান কারণ চীনের বাজার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ক্রয় কমিয়ে দেওয়া। এ কারণে মার্কিন বাজার থেকে আমাদের দেশে প্রচুর রপ্তানি আদেশ আসছে। সামনের দিনগুলোতে সে দেশ থেকে পোশাকের ক্রয়াদেশ আরো বাড়বে। আমরা এ সুযোগটি কাজে লাগাতে চাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তানি বাড়লেও সামগ্রিকভাবে পোশাক রপ্তানি পরিস্থিতি তেমন একটা ভালো না। কারণ বিশ্ব মন্দার কারণে ইউরোপসহ অধিকাংশ বাজার থেকেই এখন পোশাকের ক্রয়াদেশ কম আসছে। এজন্য চলতি মাস শেষে দেখা যাবে পোশাক রপ্তানি কম হবে। যেমন চলতি মাসের ২৬ দিনে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানিতে আয় হয়েছে দুই দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ গত মাসে, অর্থাৎ আগস্ট মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল তিন দশমিক ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাকি চার দিনে কোনোভাবেই গত মাসের সমান রপ্তানি হবে না। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে চলতি মাসে গত মাসের চেয়ে পোশাক রপ্তানি কম হবে।
এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গত দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এ কারণে ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রয়কেন্দ্রে পোশাকের বিক্রি কিছুটা কমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ালমার্ট, গ্যাপের মতো বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান পোশাক তৈরির ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিচ্ছে। চলমান ক্রয়াদেশও বিলম্বে জাহাজীকরণ করতে বলছে।বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ তৃতীয় শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক। ওই বাজারে গত বছর বাংলাদেশ ৭১৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। ২০২০ সালের চেয়ে এই আয় প্রায় ৩৭ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বরাবরের মতো পোশাক রফতানিতে চীন শীর্ষস্থানে রয়েছে। অটেক্সার তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪০ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে চীন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি হয়েছে এক হাজার ২৭৯ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পর দ্বিতীয় শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ ভিয়েতনাম। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশটি এক হাজার ৯১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে চতুর্থ ও পঞ্চম শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া ও ভারত। এছাড়া অন্যান্য শীর্ষ দেশ, যেমন- কম্বোডিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও পাকিস্তান থেকে আমদানি একই সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইপিবির তথ্য বলছে, জুলাই-আগস্ট এই দুই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২৩ দশমিক ২১ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোপের বাজারের মধ্যে জার্মানিতে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। স্পেনের বাজারে ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ। ফ্রান্সে রপ্তানি বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসা যুক্তরাজ্যে পোশাকপণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। কানাডায় পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে জাপানে রপ্তানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ৮১ শতাংশ আর ভারতে বেড়েছে ৯৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। তবে এ সময়ে রাশিয়া ও চীনে রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে ৫৮ দশমিক ২৯ এবং ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ।
পরিচালনা পরিষদঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: আরিফুল ইসলাম সাব্বির নির্বাহী সম্পাদক: রেদোয়ান হাসান বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ রফিক কমপ্লেক্স (২য় তলা), ৬৪/১, শিমুলতলা, সিআরপি রোড, সাভার, ঢাকা-১৩৪০ ফোন: ০১৫৭৬৪৬২৭০১ ই-মেইল: ajkerpost.news@gmail.com
Copyright © 2026 Ajkerpost. All rights reserved.