রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন

ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তো বিদ্যুৎখাত

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২২
  • ১১০ বার পড়া হয়েছে /

জাতীয় গ্রিডের বিপর্যয়ের পর বিদ্যুৎখাতের দুর্দশা সবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। দেশের রাজধানীতেই এলাকাভেদে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। বাণিজ্যিক এলাকাগুলোও ছাড় পাচ্ছে না। চাহিদার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়েও বহুমুখী চরম সঙ্কটে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎখাত। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনে পর্যাপ্ত জ্বালানির যোগান না থাকায় এই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। এই সঙ্কট থেকে সহসাই উত্তরণের পথ দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।বিদ্যুৎখাত সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা জ্বালানির জন্য আমদানি নির্ভর। এ কারণেই দেশের জ্বালানিখাতে বিপদ নেমে এসেছে। যার জন্য দেশের প্রত্যেকটি মানুষকে বেগ পেতে হচ্ছে। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং ডলার সঙ্কটে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করা যাচ্ছে না। তেল, গ্যাস ও কয়লা সঙ্কটে চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মাত্রা ছাড়িয়েছে লোডশেডিং। এতে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প কারখানার উৎপাদন, বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে শিল্প ও বাণিজ্য। অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অলস বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। চাহিদা কম হওয়ায় আসন্ন শীতে সঙ্কট কিছুটা কাটতে পারে। তবে আগামী গ্রীষ্মে এই সঙ্কট ফের প্রকট আকার ধারণ করবে।তারা আরো বলেন, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতের সঙ্কট কাটাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসকূপ আবিষ্কারের কোনো বিকল্প নেই। একইসাথে গ্যাস আহরণ করতে হবে। রামপাল ও আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যোগ করার উদ্যোগ নিতে হবে। পায়রার এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঢাকায় আনার জন্য দ্রুত সঞ্চালন লাইন তৈরি করতে হবে। এছাড়া দাম বেশি হলেও এলএনজি আমদানি করতে হবে, প্রয়োজনে এলপিজি দিয়েও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। এগুলোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন অব্যাহত রাখতে হবে, তাহলে সঙ্কট কেটে যাবে।পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, মূলত গ্যাস ও জ্বালানি তেল (ফার্নেস অয়েল) সঙ্কটে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। সারাদেশে গ্যাসের গড় চাহিদা তিন হাজার ৫০০ এমএমসিএফডি। স্পট মার্কেট থেকে যখন এলএনজি কেনা হতো তখন গড়ে তিন হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এখন গড়ে দুই হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৭০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজন দুই হাজার ২০০ এমএমসিএফডি, গড়ে এক হাজার এমএমসিএডি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন গড়ে ৯৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। গ্যাস দিয়ে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা থাকলেও পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অলস বসে থাকছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বন্ধ থাকা ডিজেলচালিত (ছয়টি) কেন্দ্র দিয়ে উৎপাদন শুরু করায় খরচ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আমদানি বিল পরিশোধ না করায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ফার্নেস অয়েল আমদানি করছে না। এতে বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র সক্ষমতার আংশিক উৎপাদন করছে। পাশাপাশি মেইনটেন্যান্স ও কারিগরি ত্রুটির কারণেও বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।পিডিবির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল। মাত্র ৩৬টি কেন্দ্রে সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করা হয়। ওই দিন গ্যাস সঙ্কটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ ছিল ১৬টি কেন্দ্র। আর আংশিক বন্ধ ছিল ৩১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। একইভাবে ফার্নেস অয়েল সঙ্কটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ ছিল তিনটি কেন্দ্র ও আংশিক বন্ধ ছিল ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র।পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এতোদিন কাতার থেকে গড়ে প্রতি মাসে পাঁচটি করে এলএনজির কার্গো আসত। কিন্তু চলতি অক্টোবর ও আগামী নভেম্বরে আসবে চারটি করে। ফলে জাতীয় গ্রিডে ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ কমে যাবে।এদিকে, ২০৩০ সালের মধ্যে আরো সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার ১২টি বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে এ খাতে আর্থিক চাপ আরো বাড়বে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘দেশের বিদ্যুৎখাত চরম সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অবস্থা খুবই শোচনীয়। এখন খুব বেশি কিছু করার নেই।’তিনি বলেন, ‘পশ্চিমাঞ্চল থেকে এক হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পূর্বাঞ্চলে আনতে গিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় হয়। এখন সেটা কমিয়ে ৫০০ মেগাওয়াট করা হয়েছে। আমি মনে করি, সরকার নভেম্বরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা বলেছেন। যে কাজগুলোর ওপর ভিত্তি করে তারা বলেছে সেটা যেন ঠিকঠাকমতো করে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ পূর্বাঞ্চল গ্রিডে আনা যাচ্ছে না। বলা হচ্ছে, সঞ্চালন লাইন করতে দুই মাস লাগবে, সেটা যেন দুই মাসের মধ্যেই হয়। তাহলে ৪০০-৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনা সম্ভব হবে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আগামী মার্চ মাসে উৎপাদনে আনা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। আদানি গ্রুপ থেকে যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুৎ আনা যায় তত ভালো।তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের শিল্প কারখানার উৎপাদনের অবস্থা খুবই খারাপ। ৫০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। অবস্থা বেশি খারাপ হলে বেশি দাম দিয়ে হলেও এক কার্গো করে এলএনজি আমদানি করতে হবে। প্রয়োজনে এলপিজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন চালিয়ে যেতেই হবে। সার আমরা বিদেশ থেকে আমদানি করতে পারি, প্রয়োজনে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ আপাতত বন্ধ করে দিয়ে সেই গ্যাস বিদ্যুতে সরবরাহ করা যেতে পারে।’ ডলার সঙ্কট কাটাতে বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।ড. ইজাজ বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সময়মতো উৎপাদনে এলে এটা (বেশি দামে এলএনজি আমদানি) লাগবে না।’বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে এক হাজার এমএমসিএফডির কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্যাস দিয়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল দিয়েও সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। সরবরাহ ঘাটতির জন্য উৎপাদন কমানো হয়েছে। এ জন্য লোডশেডিং বেড়ে গেছে।’তিনি বলেন, ‘রামপাল ও আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ চলে এলে আর সঙ্কট থাকবে না। এছাড়া পায়রার বিদ্যুৎ পূর্বাঞ্চলে যোগ হলেও সঙ্কট অনেকটাই কেটে যাবে। এগুলো নিয়ে কাজ চলছে।’জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে বরাবরই উৎপাদনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত হয়েছে ঠিকই কিন্তু তা যথাসময়ে চালু করা যায়নি। বিদ্যুৎখাতের উন্নয়নে শুধু উৎপাদন নয়, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে না পারলে তার জন্য সরকারকে কেন্দ্র বসিয়ে রেখে মাশুল গুনতে হবে। এখন সময় এসেছে সঞ্চালন ও বিতরণে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া। তাহলে বিদ্যুৎ খাতে একটা ভারসাম্য তৈরি হবে।

আরো পড়ুন

এস এন্ড এফ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

Developer Design Host BD