শনিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন

তেঁতুলঝোড়া বইমেলায় নতুন বইয়ের ঘ্রাণে পাঠকের ভিড়

সাভার প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩
  • ৭৯৪ বার পড়া হয়েছে /

গোলাপি ফিতায় বাঁধা চুলের ঝুঁটি। পরনে টুকটুকে লাল ফ্রক। পরীর মতো দেখতে শিশু রাইসার এখনো পড়ার বয়স হয়নি। বাবার কাঁধে চড়ে তেঁতুলঝোড়া বইমেলা ঘুরে বেড়াচ্ছিল ছোট্ট রাইসা। টিভিতে দেখা সিসিমপুরের কার্টুন চরিত্রগুলো সরাসরি বইয়ের ভেতর দেখতে পেয়ে ভীষণ খুশি সে।সোমবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের হেমায়েতপুরের জয়নাবাড়ি এলাকায় মরহুম সাংবাদিক ওয়াসিল উদ্দিন গণ পাঠাগারের আয়োজনে নয়দিন ব্যাপি তেঁতুলঝোড়া বইমেলার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বই মেলার প্রধান ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফখরুল আলম সমরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাভার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব।করোনা, নতুন স্বাভাবিকতার কাল পেরিয়ে পুরোনো ছন্দে ফিরেছে বইমেলা। সেই আনন্দ খেলা করছিল বই প্রেমীদের চোখে মুখে। মেলায় আসার খুশির আভা লেগেছিল নবীনগর থেকে আসা স্কুল পড়ুয়া তিন বোনের হাসিতে। কখন খুলবে মেলার দ্বার? তেঁতুলঝোড়া বই মেলার প্রবেশপথের সামনে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে অপেক্ষায় তারা। মেলায় আসার জন্য তর সইছিল না যেন। মাথায় রঙিন ফুলের টায়রা দিয়ে বইমেলায় রং ছড়াল স্কুলপড়ুয়া তিন বোন। সে আনন্দের আলো ছড়িয়ে গিয়েছে পুরো বইমেলাতেই। প্রকাশক, লেখক, মেলায় আসা পাঠক—সবার অভিব্যক্তিতেই সেই আনন্দ ধরা পড়ল।হাইস্কুলের ছাত্রী তাবিয়া, নাবিলা ও আয়েশা চাচা আলমগীর হাওলাদারের সঙ্গে এসেছেন মেলায়।তাবিয়া বললেন, তেঁতুলঝোড়া বইমেলায় আসব আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম আমরা। বই কিনব আর সেলফি তুলব।আরেক বোন নাবিলা বলেন, মেলায় আসতে সব সময়ই ভালো লাগে। তবে, এবারের আনন্দটা আরো বেশি। মেলা তার ঐতিহ্য ধরে রেখে এখানে বই মেলা হচ্ছে । আর মেলার বিন্যাসটাও সুন্দর।২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১ টায় মেলার ফটক খুললেও দুপুরের পর থেকে বাড়তে থাকে বইপ্রেমীদের উপস্থিতি। সন্ধ্যায় মেলা প্রাঙ্গণ ক্রেতা-দর্শনার্থী, লেখক-পাঠকে ভরে ওঠে। দ্বিতীয় দিনেই মেলা জমে ওঠায় আনন্দ প্রকাশ করেন লেখক-প্রকাশকরা।তেঁতুলঝোড়া বইমেলায় সকল নতুন বইয়ের সমাহার। এর মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ , উপন্যাস , গল্পগ্রন্থ , জীবনী , শিশুসাহিত্য , মুক্তিযুদ্ধ , ভ্রমণ , ইতিহাস , প্রবন্ধ , বিজ্ঞান , রাজনীতি , বঙ্গবন্ধু , অনুবাদ , অভিধান , স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য বিষয়ে সকল বই।একটি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মনিরুল হক বলেন, ‘মেলার শুরুতেই পাঠকের ব্যাপক উপস্থিতি শুভ লক্ষণ। দুই বছর পর স্বাভাবিক পরিবেশে মেলা শুরু হয়েছে। তবে এখনো পাঠক ঘুরে ঘুরে বই দেখছে। কেনাকাটাও শুরু হবে বলে আশা করছি।’তখন সন্ধ্যা ৬টা। সাভারের আশুলিয়া থেকে বইমেলায় এসেছেন মনির ইসলাম। একটি আইটি কোম্পানিতে চাকরি করেন তিনি। একা একা মেলায় ঘুরছিলেন তিনি। মেলার বইয়ের দোকানের সামনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বললেন, ‘গত বছর এই সময়ে মেলায় এসে দেখেছিলাম প্রস্তুতিই শেষ হয়নি। স্টলের আশপাশে ময়লা-আবর্জনা ছিল। এবার তো আমি অবাক। এত সুন্দর পরিবেশ, প্রথম দিকেই এত ভিড়!’পাঠক-দর্শনার্থীদের মতো গতকাল বিভিন্ন স্টলে লেখকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ কেউ স্টলে না বসে মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। মেলায় নতুন কী কী বই এসেছে, তার খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। গতকাল পাঠকের ভিড় জমেছিল অনেক বেশি।বই মেলায় দেখা হয় একটি প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষকের সাথে তিনি সংবাদ বলেন, অনেক বছর পর বইমেলায় আসলাম। মেলায় এসে ভালো-মন্দ কয়েকটি বিষয় লক্ষ করেছি। যা আমাকে একদিকে আশাবাদী করেছে। আশাবাদী হয়েছি এটা দেখে যে, গত কয়েক বছর মেলায় বই বিক্রির মন্দার অবসান ঘটিয়ে এ বছরের মেলা স্বাভাবিকতায় ফিরেছে। আমি চকিত জরিপে লক্ষ করেছি, মেলায় আসা মানুষের মধ্যে প্রতি দশজনে প্রায় সাতজনই বই হাতে ফিরছেন। মেলার এ দৃশ্য আমাকে আশাবাদী করেছে। এবারের বইমেলা জ্ঞানপিপাসু বাঙালির মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে তেঁতুলঝোড়া বইমেলা। কবি, লেখক, পাঠক এবং দর্শনার্থীর পদচারণায় সরগরম হয়ে উঠছে মেলাপ্রাঙ্গন। নতুন বইয়ের তাজা ঘ্রাণে আমোদিত স্টলে স্টলে বইকেনা, বই হাতে নিয়ে মোবাইলে ছবি ওঠানোর ধুম, ব্যস্ত কবি-লেখকগণের অটোগ্রাফে প্রশংসা ও আশীর্বচনে আসলেই বাঙালির প্রাণ চঞ্চল না হয়ে উপায় নেই।তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং বই মেলার প্রধান ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফখরুল আলম সমর বলেন, যেকোনো জাতির জন্য অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় বই। বইয়ের সাথে মানুষের সম্পর্ক যত নিবিড় ও ঘনিষ্টতর হবে, সেই মানুষ তত উন্নত চিত্তের অধিকারী হবে। বিশ্বের যত জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, বিপ্লবী এবং স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তির জন্ম হয়েছে, প্রত্যেকের জীবনই বইয়ের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ট সম্পর্ক। বিশ্বের ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, বিপ্লবী নেতা চে’গুয়েভারা সবসময় বন্দুকের সাথে পাবলো নেরুদার ‘কান্তো জেনারেল’ বইটি রাখতেন; বিশ্বখ্যাত আলেকজেন্ডার দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় বই পড়ে অতিবাহিত করতেন। সেই জ্ঞান বিকাশের লক্ষ্যে এই বই মেলার আয়োজন করেছি।মেলা মানেই মিলন ক্ষেত্র, তবে বইমেলা বইপ্রেমীদের কাছে আলাদা অনুপ্রেরণা। আবার বইমেলা মানেই যে শুধু বইপ্রেমীদের আনাগোনা বা বই বেচাকেনা তা নয়, বইমেলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অন্যান্য সব সংস্কৃতি। সেই প্রান্থ থেকে তৈরী করা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও জাতীয় চার নেতার জীবনি নিয়ে কর্ণার, সেখানে মেলায় আসা বইপ্রেমীসহ সাধারণ মানুষরা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে পারবে।স্বজনদের সঙ্গে বইমেলায় এসেছিল শিশুরাও। নতুন বই কিনে মেলার মাঠে বসেই বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে দেখতে থাকে তারা।

আরো পড়ুন

এস এন্ড এফ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

Developer Design Host BD