রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৪০ পূর্বাহ্ন

সীমান্তে গুলি ও গোলা, তবুও চাঙ্গা ইয়াবা কারবার

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট : সোমবার, ৩ অক্টোবর, ২০২২
  • ৮৯ বার পড়া হয়েছে / ইপেপার / প্রিন্ট ইপেপার / প্রিন্ট

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রাখাইন অঞ্চলে চলছে গোলাগুলি। একাধিকবার বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়েছে বিধ্বংসী গোলা বা মর্টারশেল, পড়েছে গুলি। এ কারণে এ পারে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তে বিরাজ করছে আতঙ্ক-উত্তেজনা। এমন এক অবস্থার মধ্যেও ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে ইয়াবা কারবারিরা। মিয়ানমারে কথিত যুদ্ধ-সংঘাতের মধ্যেও চাঙ্গা রয়েছে মরণনেশা ইয়াবার কারবার। যেখানে মিয়ানমার সীমান্তে একের পর এক ব্যাপক গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, সেখান থেকেই কীভাবে বাংলাদেশে হরহামেশা ইয়াবা ঢুকছে সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) গত সেপ্টেম্বর মাসে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত এলাকায় ৫টি বড় অভিযানে দুই লাখ ৭৩ হাজার ৬০ পিস ইয়াবা আটক করেছে। এ ছাড়া বিজিবি সেপ্টেম্বরে সারা দেশ থেকে মোট আট লাখ ৩১ হাজার ৫৯৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। তার আগের মাস অর্থাৎ আগস্টে উদ্ধার করেছে ৯ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৪ পিস ইয়াবা। তবে যা ধরা পড়েছে তারচেয়ে অনেকগুণ বেশি অধরা থেকেছে বা সেগুলো দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ হয়েছে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘মাদক সিন্ডিকেট অনেক বড় এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়েছে। ফলে যুদ্ধ বা সংঘাতেও তাদের সমস্যা হচ্ছে না। মাদকচক্রের তৎপরতা চলছেই। তবে ইয়াবার চোরাচালান বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করলে ধরা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সীমান্তে দায়িত্বরতরা।’ এর মধ্যে মাদক চোরাচালান, অবৈধ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানোসহ সার্বিক বিষয়ে আগের চেয়েও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে বিজিবি। পাশাপাশি একই বিষয়ে টেকনাফ সীমানায় সর্বোচ্চ সতর্কভাবে দায়িত্ব পালনের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। এমনকি ইয়াবা প্রতিরোধে গত সেপ্টেম্বরেও আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। কিন্তু তাতেও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখছেন না সীমান্তে কাজ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক কর্নেল মো. মেহেদী হোসাইন কবির সময়ের আলোকে বলেন, ‘গত মাসেও মিয়ানমার সীমান্ত-সংলগ্ন টেকনাফ-উখিয়া এলাকায় বেশ কয়েকটি অভিযানে বিপুল ইয়াবা আটক করা হয়েছে। তাদের ওই পারে (মিয়ানমার) কারা ইয়াবা কারবারে জড়িত বা কীভাবে ঢুকছে তা বলতে পারি না বা জানা সম্ভব হয় না। তবে আমাদের সীমানায় যখন ইয়াবার চালান ঢুকছে তখনই গোয়েন্দা তথ্য ও টহল দলের অভিযানের মাধ্যমে আটক করা হচ্ছে।’ ওই বিজিবি কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘যারা মাদক চোরাকারবারি করে তারা কেবল একটা-দুইটা দেশের নয়, এদের সিন্ডিকেট অনেক বড়। ফলে যুদ্ধ বা সংঘাত তাদের মধ্যে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তবে বিজিবি মাদক প্রতিরোধসহ সার্বিক বিষয়ে সবসময় সজাগ রয়েছে।’বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর টেকনাফের হ্নীলা এলাকায় নাফ নদীতে অভিযান চালিয়ে কক্সবাজারের দুই বিজিবির একটি টহল দল কাঠের একটি নৌকাসহ ৯০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে। তার দুদিন আগে ২০ সেপ্টেম্বর উখিয়ার বেতবুনিয়ায় ৩৪ বিজিবির অভিযানে তিনজন রোহিঙ্গা নাগরিককে এক লাখ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তার আগে ৩ সেপ্টেম্বর শাহপরীর দ্বীপ-সংলগ্ন জালিয়াপাড়ায় বিজিবির অভিযানে ৩০ হাজার ইয়াবা ও দুই কেজি ১৪১ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ বা আইস আটক করা হয়। এ ছাড়া ২ সেপ্টেম্বর বিজিবির অভিযানে হোয়াইক্যং চেকপোস্টে তিন হাজার ৬০ পিস ইয়াবাসহ একটি বাসের সুপারভাইজার ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই দিন বিজিবির পৃথক অভিযানে বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্ত এলাকা থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ মোস্তফা কামাল নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়।এদিকে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সহকারী পরিচালক আ ন ম ইমরান খান জানান, র‌্যাবের অভিযানে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৮৯ লাখ ৭৪ হাজার ৬০৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুই হাজার ৯৮ মাদক কারবারিকে। এ ছাড়া গত আগস্ট মাসেই কেবল ১১ লাখ ৬৯ হাজার ১২ পিস ইয়াবা জব্দসহ ২০৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। বিজিবি বা র‌্যাবের বাইরেও গত মাসে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত এলাকা থেকে উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক ইয়াবা উদ্ধার করেছে জেলা পুলিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। কিন্তু কোনোভাবেই মিয়ানমারে তৈরি মাদক ইয়াবা-আইসের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না দেশের যুবসমাজকে।এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের (ডিএনসি) অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ইয়াবা তৈরি হয় মূলত মিয়ানমারে। মাদকের মধ্যে ইয়াবা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় বিপদে ফেলেছে। এসব বিষয়ে গত সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মিয়ানমারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছি। তাদের শক্তভাবে জানানো হয়েছে, আমরা বৈধ মাদক নিয়ন্ত্রণ করব এবং অবৈধ মাদক যে কোনো উপায়ে প্রতিরোধ করব। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার আমাদের সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে। নিজেদের সীমানায় মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর কথাও জানিয়েছে দেশটি।কক্সবাজার ও বান্দরবানের স্থানীয় একাধিক সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজারের সাথে মিয়ানমারের ১২০ কিলোমিটার ও বান্দরবানের আলীকদম এবং নাইক্ষ্যংছড়ির সঙ্গে ১৮০ কিলোমিটার সীমানা রয়েছে মিয়ানমারের। এ সীমানা এলাকায় বড় কোনো নদী নেই। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে হেঁটেই যাওয়া হয় দেশটিতে। মিয়ানমার সীমান্তে সংঘাত-উত্তেজনার মধ্যেও সীমান্তের কুরুকপাতা, বাইশারী, তুমব্রু, ঘুমধুম, বাইশফাঁড়ি, আশারতলী, জামছড়ি, বম্বনিয়া এবং কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ইয়াবা চোরাচালান বেড়েছে। তবে ভীতিকর বা উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও কীভাবে ইয়াবার চালান ঢুকছে তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে নানা আলোচনা। মিয়ানমারের বাহিনীগুলোর সহযোগিতা ছাড়া এটা সম্ভব নয় বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

 

সর্বোচ্চ সতর্কতায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড : রোববার কোস্ট গার্ড সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার খন্দকার মুনিফ তকি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, পাশের দেশের (মিয়ানমার) অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় বাংলাদেশের টেকনাফ সীমানায় যেন বিন্দুমাত্র বিরূপ পরিবেশ সৃষ্টি না হয় সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। মানব পাচার, চোরাচালান, মাদকদ্রব্য পাচারসহ নতুনভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ রোধে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে কোস্ট গার্ড। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সুযোগে অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন কোস্ট গার্ডের সদস্যরা। সমুদ্রে সার্বক্ষণিক টহল জাহাজ মোতায়েনসহ টেকনাফ থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত রাত-দিন নিয়মিত অত্যাধুনিক হাইস্পিড বোটের মাধ্যমে টহল চলমান। এ ছাড়াও টেকনাফ, শাহপরী, বাহারছড়া ও সেন্টমার্টিনে বর্তমানে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেকোনো প্রকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

আরো পড়ুন

এস এন্ড এফ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

Developer Design Host BD