
সাভারের হেমায়েতপুর ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার উপায় নেই। আমবার ফ্যাক্টরি থেকে সিরাজ কমপ্লেক্স পর্যন্ত ড্রেন উপচে নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানি থৈ থৈ করছে ফুটপাথে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা প্লাস্টিক আর রেস্টুরেন্টের বর্জ্যে ড্রেনটি একপ্রকার অচল হয়ে গিয়েছিল। সামান্য বৃষ্টি হলেই এই অঞ্চলের হাজার হাজার পোশাক শ্রমিক আর পথচারীদের এই নোংরা পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হতো।
নানা জায়গায় জানিয়েও যখন সুরাহা মেলেনি, তখন এই জনভোগান্তি দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের মাধ্যমে জনদুর্ভোগ কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড শ্রমিকদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা। তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসানের নির্দেশনায় গত তিন দিন ধরে তারা রাত জেগে বুক সমান নোংরা পানিতে নেমে এই ড্রেন পরিষ্কারের কাজ করছেন। যখন পুরো সাভার ঘুমে ঠিক তখন কাদা-ময়লা মাখানো শরীরে এই তরুণেরা স্লাব তুলে আবর্জনা পরিষ্কার করছেন।
তবে এই প্রশংসনীয় উদ্যোগে স্থানীয় সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেলেও, চরম উদাসীনতা ও অমানবিক আচরণ লক্ষ্য করা গিয়েছে মহাসড়ক ঘেঁষা বহুতল ভবনের বাড়িওয়ালা, বড় বড় মার্কেট কর্তৃপক্ষ এবং রেস্টুরেন্ট মালিকদের। ড্রেন পরিষ্কারের এই কর্মযজ্ঞে তারা তো কোনো সাহায্য করেনইনি, উল্টো কাজ করতে গিয়ে নানামুখী বাধা ও নিরুৎসাহী কথাবার্তার মুখোমুখি হতে হয়েছে স্বেচ্ছাসেবীদের।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া শ্রমিকদলের স্থানীয় এক কর্মী আক্ষেপ করে বলেন, ভাই রেস্টুরেন্ট আর মার্কেটের ময়লা কেমিক্যালেই ড্রেনটা জ্যাম হইছিল। গন্ধের কারণে এখানে দাঁড়ানো যায় না, আমরা সেই ময়লা হাত দিয়ে সেচে তুলছি। একটু ভালো মনে আমাদের পাশে দাঁড়ানো বা এক গ্লাস পানি দিয়ে সাহায্য করা তো দূরের কথা, কোনো কোনো মার্কেট মালিক এসে উল্টো ধমক দিয়ে বলে—এখানে ময়লা স্তূপ করে রাখছেন কেন? রাতে কাজ করতেছেন কেন? এসব দেখলে কষ্ট লাগে।
স্বেচ্ছাসেবী এই দলের নেতৃত্ব দেওয়া যুবদলের এক কর্মী জানান, রাতের বেলা মহাসড়কে মানুষের চলাচল কম থাকে বলে আমরা এই সময়টা বেছে নিয়েছি, যাতে দিনের বেলা মানুষের ভোগান্তি না হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যাদের বাড়ির সামনের ড্রেন পরিষ্কার করছি, সেই বাড়িওয়ালা বা মার্কেট মালিকদের কাছে একটু সহযোগিতা চেয়েও আমরা পাইনি।
আমবার ফ্যাক্টরি এলাকার স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, এই ছেলেরা নিজেদের পকেটের পয়সা খরচ করে, রাত জেগে আমাদের এই নরক যন্ত্রণা থেকে বাঁচানোর জন্য কাজ করতেছে। অথচ এই রোডের বড় বড় কোটিপতি বাড়িওয়ালা আর রেস্টুরেন্ট মালিকদের একটা মানুষ দিয়েও সাহায্য করতে দেখলাম না। তারা শুধু চেনে নিজেদের ব্যবসা। এদের কারণেই ড্রেনটা বন্ধ হয়েছিল, এখন পরিষ্কার করতে আসাতেও তাদের গায়ে লাগছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, প্রতিদিন এই ড্রেনের গন্ধ আর নোংরা পানির কারণে কাস্টমাররা দোকানে আসতে চাইতো না। এই ছেলেরা যে কষ্ট করে গন্ধ সহ্য করে ড্রেন পরিষ্কার করতেছে, এটা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু বড় বড় বিল্ডিংয়ের মালিকরা বা রেস্টুরেন্টওয়ালারা একটা কাপ চা খাইয়েও এই ছেলেদের পাশে দাঁড়ায় নাই, এটা আমাদের এলাকার জন্য লজ্জাজনক।
সিরাজ কমপ্লেক্সের সামনের এক চা দোকানি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সিপি রেস্টুরেন্টসহ আশেপাশের বড় দোকানগুলোর বর্জ্যই তো ড্রেনটা শেষ করেছে। তারা নিজেরা কোনোদিন এক কোদাল মাটিও সরায় নাই। আজ যখন মেহেদী ভাইয়ের লোকজনেরা এসে এলাকাটা পরিষ্কার করতেছে, তারা নাক সিটকাচ্ছে।
কিছু স্থানীয়দের এমন চরম অসহযোগিতা এবং বিরূপ মন্তব্যের মুখেও নিজের সিদ্ধান্ত ও জনকল্যাণের লক্ষ্য থেকে এক চুলও নড়েননি বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান। কর্মীদের সাথে নিয়ে তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ তদারকি করছেন।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান সরাসরি বলেন, কে আমাদের নিরুৎসাহিত করল, আর কোন বড় লোক বা ভবন মালিক আমাদের সাহায্য করল না—সেটা দেখার বিষয় আমাদের না। বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ও ঢাকা -২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আমান উল্লাহ আমানের নির্দেশনায় আমাদের লক্ষ্য হেমায়েতপুরের খেটে খাওয়া মানুষ আর পথচারীদের এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়া। ছেলেরা বুক সমান ময়লা-পানিতে নেমে অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। আমরা আমাদের লক্ষ্যে অটল। এই ড্রেনের পানি চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই কাজ থামবে না।