রবিবার, ১৯ মে ২০২৪, ০১:৪৬ পূর্বাহ্ন

আয় কমছে রাষ্ট্রের

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর, ২০২২
  • ১১১ বার পড়া হয়েছে / ইপেপার / প্রিন্ট ইপেপার / প্রিন্ট

ব্যয়ের চাপে দিশেহারা সবাই। সাধারণ নাগরিক, রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক বাজার সবখানে পণ্য মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে অনেক মানুষের আয় আগের তুলনায় কমেছে। আয় বেড়েছে এমন মানুষের সংখ্যা অতিনগণ্য। অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রয়োজনীয় পণ্যের কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।নিত্যদিনের ব্যয় সামলাতে মানুষ আগের জমানো সঞ্চয় ভেঙে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। আবার দেশের রপ্তানি ও রেমিট্যান্স এই দুই খাতের আয় একসঙ্গে কমেছে। এসব পরিস্থিতি অর্থনীতিতে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।বিশ্ববাজারের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। গম, ভুট্টার মতো খাদ্যপণ্যের দামসহ বেড়েছে বিভিন্ন কাঁচামালের দামও। এতে দেশের বাজারে সবধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম একলাফে কয়েকগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষের ভোগব্যয় বেড়েছে। খরচের সঙ্গে পেরে না ওঠায় অনেক মানুষ সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংকে জমানো আমানত ভাঙতে শুরু করেছে। এতে করে টাকা চলে যাচ্ছে ব্যাংকের বাইরে। কেউ আবার মেয়াদপূর্তিতেও পুনর্বিনিয়োগ না করে টাকা তুলে নিচ্ছেন। অব্যাহতভাবে আমানত কমলে ব্যাংকে তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে। এ বিষয়ে এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি বলে তারা মনে করেন।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সঞ্চয় কমে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। গ্রাহকরা দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সঞ্চয় ভাঙলে সেটা আরও খারাপ। ভোক্তাদের ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের মিল নেই। ফলে তারা সঞ্চয় ভাঙছে। দ্রব্যমূল্য বাড়ার কারণে এমনটি হয়েছে। এখন দ্রব্যমূল্য কমাতে হবে। তখন ভোক্তার ব্যয় কমবে। সঞ্চয় বাড়তে শুরু করবে। বাজার দরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কয়েক মাস ধরে চাল, ডাল, গম, তেল, ময়দা, লবণসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের পাশাপাশি খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের দামও বেড়েছে। এর মধ্যে পোশাক, খাতা-কলম, বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত ভাড়া। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পরপরই জীবনযাত্রার খরচ বাড়তে শুরু করে।বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকগুলোতে যেখানে তারল্য প্রবাহ বাড়ার কথা, সেখানে গত এক বছরে তা কমেছে। গত বছরের জুনে ব্যাংকিং খাতে মোট তারল্য ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। গত জুনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে তারল্য কমছে ৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের আয় গত বছরের তুলনায় ১৪ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। এটি মানুষের সঞ্চয় কমে যাওয়ার একটি চিত্র।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সাধারণত সঞ্চয় করেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ। মূল্যস্ফীতির গড় হিসাব সরকারিভাবে যা প্রকাশ করা হচ্ছে, তার চেয়ে নিত্যপণ্য কেনার খরচ বাস্তবে অনেক বেশি। ফলে সংসার চালাতে সঞ্চয়ে হাত দিচ্ছেন তারা। তিনি আরও বলেন, বাজার অর্থনীতিতে রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (আরওআই) বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা যদি বিভিন্ন বাজারে রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট দিতে না পারি, তাহলে উন্নতি করা কিন্তু কঠিন হবে। কারণ যারা সঞ্চয়কারী, তারা যে শুধু সঞ্চয় দেশে রাখবে তা নয়, তারা বিদেশেও সঞ্চয় করতে পারে। কাজেই আমাদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হবে। নইলে টাকা পাচার হয়ে যাবে। তাই সঞ্চয়কে বাজারে আকর্ষণীয় রাখতে হবে।এদিকে মানুষের ব্যয়ের এই দুঃসময়ে চাপে পড়েছে রাষ্ট্রও। বৈদেশিক খাতের আয় একসঙ্গে কমেছে। রেমিট্যান্স কমেছে ২৪ শতাংশ আর রপ্তানি আয় কমেছে ৬ শতাংশের বেশি। এতে কমতির ধারায় থাকায় রিজার্ভ আরও বেশি চাপে পড়ছে।সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউরোপে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এতে প্রবাসীরা কম পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠাতে পারছেন। একই কারণে কমেছে পণ্য রপ্তানির ক্রয়াদেশ (অর্ডার)। আবার দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকটেও কারখানায় উৎপাদন কমেছে। এছাড়া প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ে ডলারের দুই ধরনের দাম বেঁধে দেওয়ার কারণেও প্রবাসী আয় আসার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের উৎসগুলোর তিনটি খাত হচ্ছে রপ্তানি খাত, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদান। প্রবাসী আয় ও রপ্তানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ে, যা দেশের সক্ষমতা বাড়ায়। শ্রীলংকার সংকটে পড়ার কারণ, দেশটির কাছে পণ্য আমদানি করার মতো এবং বৈদেশিক দেনা পরিশোধের মতো বৈদেশিক মুদ্রা নেই। পাকিস্তানও একই কারণে বিপাকে রয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৩ কোটি ডলার, যা গত ৭ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর চেয়ে কম রেমিট্যান্স আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ১৪৯ কোটি ডলার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স আসে ১৭২ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। সব মিলিয়ে অর্থবছরে প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৫৬৭ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময় রেমিট্যান্স আসে ৫৪০ কোটি ডলার।এদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, করোনা মহামারির প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর বেশ ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিল পণ্য রপ্তানি খাত। টানা ১৩ মাস ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত রপ্তানি আয়ও হোঁচট খেল। সেপ্টেম্বরে ৩৯১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কম।ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মূলত তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় সাড়ে ৭ শতাংশ কমে যাওয়ার কারণে গত মাসে সার্বিক পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তৈরি পোশাক ছাড়া হোম টেক্সটাইল ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে।রপ্তানি কমে যাওয়ার বিষয়ে তৈরি পোশাকশিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, তিন মাস ধরে পোশাকের নতুন ক্রয়াদেশ আসার গতি কম। কয়েকটি বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বেশ কিছু ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে। আবার যতটুকু ক্রয়াদেশ আছে, তার সবটুকুও গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকটের কারণে রপ্তানি করতে পারেননি উদ্যোক্তারা।এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমে যাওয়ার ফলে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো রিজার্ভ। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগে থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে। গত বছর আগস্টেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি ছিল। সর্বশেষ হিসাবে গত ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি ডলার। ইতোমধ্যে রিজার্ভ ১ হাজার ১৫৬ কোটি ডলার কমে গেছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় এভাবে কমতে থাকলে রিজার্ভ আরও কমে যাবে। এতে অর্থনীতির চাপ আরও প্রকট হবে।

আরো পড়ুন

এস এন্ড এফ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

Developer Design Host BD