রবিবার, ০২ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ন

আইএমএফের ঋণ: সেই শর্ত নিয়েই চিন্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট : শুক্রবার, ৪ নভেম্বর, ২০২২
  • ২২০ বার পড়া হয়েছে /

চলমান অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে ঋণদাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি সংস্থাটির এক প্রতিনিধি দল আলোচনার জন্য ঢাকায় এসেছে। আসার পর কয়েক দফা সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠকও করেছেন তারা। প্রত্যেক বৈঠকে এক এক করে শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন তারা। তবে শর্তগুলো বেশিরভাই পুরনো। শর্ত নতুন বা পুরনো যাই হোক তার চেয়ে বড় ভাবনার বিষয় সংস্থাটির ঋণ দেশের মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না তো। সূত্র বলছে, ঋণ নিয়ে আলোচনা করতে ঢাকায় আসা আইএমএফের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল এখনো দেশেই অবস্থান করছে। দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ডেপুটি প্রধান রাহুল আনন্দ। ঋণ নেওয়ার বিষয়টি চাউর হওয়ার আগে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান, রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মানের করা, বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সারে ভর্তুকি এবং নগদ সহায়তা কমিয়ে আনা, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়সহ নানা পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এর অনেক আগে থেকেই এসব খাতে ব্যাপক সংস্কারের কথা বলে আসছিলো।কিন্তু আইএমএফের ওপর কোনো কারণে নির্ভরশীল না থাকায় এতদিন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এসব পরামর্শ আমলে নেয়নি। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপে পড়েছে।আর চাপ সামলাতে সরকার আইএমএফের কাছে সাড়ে চার বিলিয়ন (৪৫০ কোটি) ডলার ঋণ চেয়েছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে আইএমএফ এই ঋণ দিতে প্রাথমিকভাবে রাজিও হয়েছে। তবে সুযোগ বুঝে পুরনো পরামর্শগুলোকেই এখন ‘শর্ত’ হিসেবে হাজির করে সরকারকে বাস্তবায়ন করতে বলছে। ইতিমধ্যে আইএমএফ প্রতিনিধিদল অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে জানিয়ে দিচ্ছে কোথায় কী ধরনের সংস্কার করতে হবে।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতিতে পরিবর্তন, মুদ্রানীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি, ঋণের সুদ ও মুদ্রার বিনিময় হার, সঞ্চয়পত্রের সুদহার, বন্ড ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব করা হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই। রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সোমবার (৩১ অক্টোবর) অর্থ বিভাগের সাথে বৈঠক করেছে প্রতিনিধিদলটি। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি কমানোর পরামর্শ দিয়েছে তারা। এছাড়া সরকারি বড় বড় কোম্পানিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রমে সরকারের হস্তক্ষেপ, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালকদের ‘রাজনৈতিক’ নিয়োগ, ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিক হারে খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ জানতে চেয়েছে এবং এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে। আইএমএফের এসব প্রস্তাবকে সমর্থন করেছেন অর্থনীতিবিদরা। সার্বিক বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও কাজ করছে।আইএমএফকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ জানিয়েছে, আর্থিক খাতের সংস্কারে ইতিমধ্যে কয়েকটি আইন সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আশা করছে, এতে খেলাপি ঋণ অনেক কমে যাবেঅর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব ফাতেমা ইয়াসমিন বলেছেন, আইএমএফের সাথে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ আলোচনা চলবে। আমরা ইতিবাচক কিছু প্রত্যাশা করছি। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। ব্যয় কমানো ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে সংস্থাটি। আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশে কেন দেরি হলো, এর কারণ জানতে চেয়েছে আইএমএফ। একইসাথে সঠিক সময়ে যেন এ তথ্য প্রকাশ করা হয় সে বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।পাশাপাশি তিন মাস পরপর জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য দেয়ার কাজের বর্তমান অবস্থা ও অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাথে বৈঠকে আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আর এ জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে করছাড় কমাতে হবে। এ ছাড়া রাজস্ব খাতে কিছু সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। আর করকাঠামো আধুনিকায়ন ও আর্থিক খাতের সংস্কারের বিষয়ে এনবিআর যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেসব বিষয়েও নতুন ব্যাখ্যা চেয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দেয়া আইএমএফের প্রস্তাবকে যুক্তিসংগত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। অর্থনীতিবিদরা বলেন, আইএমএফ এনবিআরকে যে পরামর্শ দিয়েছে তা যথাযথ। বিদ্যুৎখাতে সরকারের ভর্তুকির বিকল্প কী, তা জানতে চেয়েছে আইএমএফ। ঋণদাতা সংস্থাটির সফররত প্রতিনিধি দল বলেছে, বিদ্যুৎখাতে উৎপাদন খরচ ও বিক্রির মধ্যে ঘাটতি কমাতে মূল্য সমন্বয় করা যেতে পারে। এটি না হলে ভর্তুকির পরিবর্তে বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে কী হবে, তা-ও জানতে চেয়েছে তারা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) কমার বিষয়েও জানতে চেয়েছে আইএমএফ।বৈঠক সূত্র বলছে, ২০৩০ সালের পর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া কমবে কি না, এ বিষয়ে আইএমএফ প্রশ্ন করেছে।এছাড়া ভাড়াভিত্তিক (রেন্টাল) বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক প্রভাবও জানতে চেয়েছে আইএমএফ।অর্থ বিভাগ সূত্র জানান, সংস্থাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই বলে আসছে। কেননা কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি স্বাধীন সংস্থা হলেও স্বাধীনভাবেই অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন, মূল্যায়নের ব্যাপারে সরকার ও বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আসছে। এতে উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। ব্যাংক খাতে সুদহার নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রানীতি, সরকারি ব্যাংকে হস্তক্ষেপসহ নানাভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজে বাধা দেয়া হচ্ছে বলে মনে করে আইএমএফ। আইএমএফ মনে করে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার নিয়ন্ত্রণ করলেও বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা করতে পারে না। এমনকি সরকারের নির্দেশে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইভাবে মুদ্রানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম কাজ হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা করতে পারছে না।এখানে আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ। বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য সবুজ সংকেত দিয়েছে- ঋণ ও আমানতের বেঁধে দেওয়া সুদহারের বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।গত বুধবার (২ নভেম্বর) পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আইএমএফের মাধ্যমে আমরা পরিচালিত নই। তাদের সব কথা আমরা গিলবো না। তাদের (আইএমএফ) কাজ তারা করবে, আমাদের কাজ আমরা করবো। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, আইএমএফ যে শর্তগুলো দিচ্ছে সেগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে এখনই মন্তব্য করা ঠিক হবে না। কারণ আইএমএফ শর্তগুলো প্রথমত তাদের বোর্ডে তুলবে এরপর প্রকাশ করবে। তখন মন্তব্য করা সহজ হবে। তবে আপাতত মনে হচ্ছে আইএমএফ যে শর্তগুলো দিয়েছে তা হুট করে পরিপালন করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হতে পারে।উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই ব্যালান্স অব পেমেন্ট, বাজেট সহায়তা ও অবকাঠামো খাতের জন্য চার দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়ে আইএমএফের কাছে চিঠি দেয় সরকার।

আরো পড়ুন

এস এন্ড এফ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

Developer Design Host BD