শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ০৭:২২ অপরাহ্ন

রাশিয়ার খেরসন শহর ছেড়ে যাওয়ার কৌশলগত গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট : রবিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২২
  • ৯১ বার পড়া হয়েছে / ইপেপার / প্রিন্ট ইপেপার / প্রিন্ট

ইউক্রেন যুদ্ধে আরও একটা বড় ঘটনা ঘটল রাশিয়ার সেনাদের খেরসন শহর ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। ইউক্রেনের দক্ষিণের খেরসন প্রদেশ দখল করে নেওয়ার পর মস্কো গত সেপ্টেম্বরের শেষে ইউক্রেনের আরও তিনটি প্রদেশসহ রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের অংশ বলে ঘোষণা দেয়; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনীয় আক্রমণে দেশটার সবচেয়ে বড় ও নিপার নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত খেরসন শহরে রুশ সেনাদের অবস্থান হুমকির মাঝে পড়ে যায়।এ কারণে গত ৯ নভেম্বর রুশ কর্মকর্তারা খেরসন শহর ছেড়ে যেতে রুশ ইউনিটিগুলোকে নির্দেশ দেয়। অনেকেই ধারণা করছিলেন, খেরসন শহর ছেড়ে না এলে কয়েক হাজার রুশ সেনা নদীর ওপাড়ে আটকা পড়তে পারত। এর মাধ্যমে রুশরা নিপার নদীর পশ্চিম তীরে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানটা হারাল। ১১ নভেম্বর রুশ সেনারা শহর পুরোপুরি ছেড়ে যাওয়ার আগেই ইউক্রেনের কর্মকর্তারা খেরসনে প্রবেশ করে সিটি হলের ওপরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।তবে রুশদের মাঝে অনেকের জন্যই খেরসন ছেড়ে আসাটা ছিল কষ্টকর ও অপমানজনক। রুশ সাংবাদিক ইউরি কোতিওনোক এক টেলিগ্রাম পোস্টে প্রশ্ন করেন- রুশরা কেন সেখানে সবকিছু ধ্বংস করে ও জ্বালিয়ে দিয়ে এলো না? নিপার নদীর ওপরে নোভা কাখভকা বাঁধও ইউক্রেনীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই বাঁধ ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে সেচের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এখান থেকে খালের মাধ্যমে ক্রিমিয়া উপদ্বীপে পানি পৌঁছায়। ২০১৪ সালে রুশদের দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপে বড় কোনো পানির উৎস নেই। ইউক্রেনীয়রা ক্রিমিয়াতে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল।সেজন্য যুদ্ধের শুরুতেই রুশদের একটা লক্ষ্য ছিল ক্রিমিয়াতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। এখন ইউক্রেনীয়রা আবার ক্রিমিয়ায় পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। ইউক্রেনীয় বিশ্লেষক আলেক্সেয় কুশ বলেন, খেরসন শহর নিপার নদীর নদীপথ ও এর ওপরে শিপইয়ার্ডগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও রুশদের হাতে এখনো নিপার নদী থেকে কৃষ্ণ সাগরের প্রবেশস্থলে কিনবার্ন স্পিটের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল ও মার্কিন থিংকট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মিক রায়ান টুইটারে এক বিশ্লেষণে বলেছেন, রুশদের খেরসন ছেড়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, তারা আত্মসমর্পণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের ইউনিটগুলো পুনর্গঠন করছে।রুশরা দুর্বল হলেও তাদের দখল করা অঞ্চলগুলো ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা নেই। খেরসন থেকে সরিয়ে নেওয়া সেনাদের কোথায় মোতায়েন করা হয়েছে, সেটি দেখে বোঝা যাবেÑ রুশ সেনাদের যুদ্ধ করার সক্ষমতা কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং রুশ জেনারেল সুরভকিন ২০২৩ সালের শুরুতে কিসের ওপরে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।অপেক্ষাকৃত কম এলাকা রক্ষা করতে হবে বলে সুরভকিনের পক্ষে সেনাদের সংগঠিত করা কিছুটা সহজ হবে। আর রুশদের অবস্থান শক্ত করার অর্থ হলো যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়া। যদিও ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলছেন, খেরসন রাশিয়ার অংশ ছিল এবং এতে কোনো পরিবর্তন হবে না।যুক্তরাষ্ট্রের থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) এক বিশ্লেষণে বলেছে, আসন্ন শীতকাল রুশ সেনাদের জন্য বেশি কঠিন হবে।অপরদিকে ইউক্রেনীয়রা হয়তো শীতকালেও তাদের আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারে। শীতকালে মাটি শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে শরৎকালের কর্দমাক্ত সময়ের তুলনায় ভূমির ওপর দিয়ে চলাচল আরও সহজ হবে।ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রব লি টুইটারে এক বিশ্লেষণে বলেন, রুশ সেনারা মনোবলের দিক থেকে ইউক্রেনীয়দের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এ কারণে শীতকালের খারাপ আবহাওয়াকেও ইউক্রেনীয়রা সুযোগ হিসেবে নিয়ে তাদের পুনর্দখল করা অঞ্চলের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে চাইতে পারে।জার্মানির ব্রিমেন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর নিকোলায় মিত্রোখিন বলেন, খেরসন হারানোয় ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলে রুশদের আক্রমণ করার সক্ষমতা খুবই কমে গেল। এখন রুশদের হাতে রয়েছে অর্ধচন্দ্রাকৃতির একটা ভূখণ্ড। ইউক্রেনীয় সেনারা পরবর্তীতে খেরসন প্রদেশের পূর্বদিকে আজভ সাগরের তীরবর্তী মেলিটোপোল, বেরদিয়ানস্ক ও মারিওপোলের দিকে আক্রমণ চালালে রুশরা বর্তমানে তাদের হাতে থাকা খেরসন প্রদেশের অঞ্চলগুলোও ছেড়ে দিয়ে ক্রিমিয়াতে অবস্থান নিতে বাধ্য হবে।একইসঙ্গে রুশরা যুদ্ধের শুরুতে ইউক্রেনের দক্ষিণের ওডেসা বন্দর ও মলদোভার বিচ্ছিন্নতাবাদী ট্রান্সনিস্ত্রিয়া অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, তা এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে।অপরদিকে ব্রিটিশ থিংকট্যাংক সেন্ট্রাল এশিয়া ডিউ ডিলিজেন্সের প্রধান আলিশার ইলখামমভ বলেন, ইউক্রেনে রুশদের সামরিক বিপর্যয়ে রাশিয়ার সম্মান যেমন আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, তেমনি তা মধ্য এশিয়াতে ভূরাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করেছে। এই শূন্যতার জায়গাটা নিতে যাচ্ছে চীন ও তুরস্ক।জেনারেল মিক রায়ান বলেছে, খেরসন ছেড়ে আসার সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিতে রুশদের ইউক্রেনের ওপরে কৌশলগত হামলা করে যেতে হবে, যাতে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে থাকে। এক্ষেত্রে ইরানের কাছ থেকে আমদানি করা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কাজে আসতে পারে।ওয়াশিংটন পোস্টের এক লেখায় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ফেলো ম্যাক্স বুট বলেন, খেরসনে ইউক্রেনের বিজয় রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা কোয়ালিশনকে টিকিয়ে রাখবে এবং মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগেই ইউক্রেনের জন্য আরও অস্ত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে পারে।রুশ বিশ্লেষক পাভেল লুজিন দ্য ইনসাইডারের এক লেখায় বলেছেন, রাশিয়ার সামনে এখন কোনো কষ্টহীন পথ নেই। যদি ক্রেমলিন নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, তা হলে হয়তো বাকি দুনিয়া থেকে আরও বেশি দূরে সরে যেতে হতে পারে। আর নিয়ন্ত্রণ না রাখতে পারলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দলে বড় কোনো পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

আরো পড়ুন

এস এন্ড এফ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

Developer Design Host BD